কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল: ব্রিটিশ সম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের প্রতীক

কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ব্রিটিশ সম্রাজ্যের গৌরব ও পতনের সাক্ষী, ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিকে সঙ্গী করে তৈরি হয়েছে। রানির মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে এই স্মৃতিসৌধের পরিকল্পনা শুরু হয়, যা তাজমহলের আদলে নির্মিত হলেও ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাবও রয়েছে। রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত এই সৌধটি এখন জাতীয় সংগ্রহালয়ের অংশ এবং শহরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। রানির রাজত্বকালে (১৮৫৭-১৯০১) কলকাতা ছিল ভারতের কেন্দ্রবিন্দু। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯০৬ সালে এবং ১৯২১ সালে এটি সম্পন্ন হয়। স্যার উইলিয়াম এমারসন নকশা করেন, যেখানে ইন্দো-সারাসেনিক ও মুঘল শিল্পকলার সংমিশ্রণ দেখা যায়। শ্বেতপাথরের এই সৌধটির উচ্চতা ৫৬ মিটার এবং এর কেন্দ্রে বিশাল গম্বুজ রয়েছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আজও লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে। এই স্মৃতিসৌধের অবস্থান ছিল অতীতে প্রেসিডেন্সি জেলের জমি, যা পরবর্তীতে আলিপুরে স্থানান্তরিত হয়। কলকাতার ইতিহাসের অঙ্গীকার, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আজও স্মৃতির চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা প্রধান সড়ক ধরে যেতে গেলে মনে হয় এক নতুন জগতে প্রবেশ করছি। উঁচু সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে ঢুকে প্রথম নজরে আসে রানী ভিক্টোরিয়ার আবক্ষ মূর্তি, যা কুইন্স হলের কেন্দ্রবিন্দু। এই হলের দেয়ালে বিভিন্ন বিদেশি ও দেশীয় বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি রয়েছে, যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। এখানে নন্দকুমারের জালিয়াতি সংক্রান্ত দলিল এবং পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত কামানও রাখা রয়েছে। কুইন্স হলের গ্যালারিতে রানীর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন চিত্র ও ঘোষণা শোভা পাচ্ছে, যেমন তার সিংহাসনের অভিষেক ও ব্যক্তিগত জীবনের মুহূর্ত। এছাড়া রানীর ব্যবহৃত নানা সামগ্রীও প্রদর্শিত হচ্ছে, যেমন তার শৈশবে ব্যবহৃত পিয়ানো এবং ভারতীয় প্রজাদের উদ্দেশ্যে লেখা শেষ চিঠি। বিক্রির জন্য উপলব্ধ সাড়ে তিন হাজার নিদর্শন, ব্রিটিশ আমলের অস্ত্র ও নৌযানসহ, দর্শকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে। মেমোরিয়ালের আশেপাশে আরও অনেক ভাস্কর্য রয়েছে, যেগুলো ব্রিটেন থেকে আনা হয়েছে। রানির স্মৃতি সৌধ তৈরির প্রস্তাব করেছিলেন ব্রিটিশ ভাইস চ্যান্সেলর, তবে এর খরচ বহন করতে হয়েছিল স্থানীয় জনগণের উপর। লর্ড কার্জন ভারতের রাজা ও ব্যবসায়ীদের কাছে অর্থ সংগ্রহের জন্য আবেদন করেন। ভিক্টোরিয়া মিউজিয়াম প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ৫০০ টাকা, তবে সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য এটি ১০০ টাকায় সীমিত। প্রতি বছর লাখো পর্যটক এখানে আসেন, এবং বিশেষ দিনগুলিতে লেজার শো অনুষ্ঠিত হয়, যা কলকাতার অতীতকে জীবন্ত করে তোলে। এই সৌন্দর্য ও ইতিহাসের মিলনস্থল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, কলকাতার হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ এ ৭:৩৯ PM